নীতিসহায়তার অভাবকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা

থমকে আছে আসবাব শিল্পের রফতানি সম্প্রসারণ

আসবাব শিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে। তার পরও এ খাত সম্ভাবনার মধ্যেই আটকে রয়েছে, নতুন নতুন জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।

আসবাব শিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে। তার পরও এ খাত সম্ভাবনার মধ্যেই আটকে রয়েছে, নতুন নতুন জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে কাঁচামালের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক, বন্ড সুবিধা না থাকা এবং ব্যাংক ঋণের জটিলতা। এর ফলে দেশে-বিদেশে অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে আসবাব শিল্পকে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে উৎপাদিত আসবাবের ৯০-৯৫ শতাংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। পণ্যের কাঁচামালে শুল্ককর ৬৮-১০৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের জটিলতা ও বন্ড সুবিধা না থাকায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। যার ফলে দেশের বাজারেও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

কাঁচামালে উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে এ খাতে সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে সরকারকে অবহিত করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা)। ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, কাঁচামালের উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে দেশের আসবাব শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে রফতানি বাজারে পিছিয়ে পড়ছে এ খাত। পোশাক ও বস্ত্র খাতের পর দেশে সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে। বর্তমানে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর পরিধি বাড়লে আরো কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। শুধু কাঁচামালের ওপর শুল্কের প্রভাবই নয়, শতভাগ রফতানি খাত না হওয়ায় এখানে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধাও নেই।

বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির চেয়ারম্যান সেলিম এইচ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌কাঁচামালের হাই ডিউটির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি ছিল ২০ শতাংশ, যা সম্প্রতি ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এসবের পরও যেসব নীতিসহায়তার ঘোষণা সরকার দিয়েছে, সেগুলোও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমদানি-রফতানি নীতিতে যেসব শিল্প আংশিক রফতানি করে তাদেরও শতভাগ ব্যাংক গ্যারান্টি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা তা পাচ্ছি না। ফলে এ শিল্পের সমস্যাগুলো কমার বদলে বাড়ছে।’

আসবাব শিল্পের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভিয়েতনাম। দেশটির ট্রেড প্রমোশন এজেন্সির তথ্যমতে, এ খাতে ২০১৮ সালে রফতানি হয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিগত সময়ে রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ দশমিক ৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। ২০২৪ সালে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের আসবাব রফতানি করেছে দেশটি। অর্থাৎ মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। যেখানে বাংলাদেশের রফতানি এখনো ১ বিলিয়ন ডলার ছুঁতে পারেনি। ভিয়েতনামের ফার্নিচার খাতের সফলতার পেছনে সরকারের নীতিসহায়তা, সমর্থনমূলক অর্থনৈতিক সংস্কার ও কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তি অন্যতম ভূমিকা রেখেছে।

আসবাব খাতের উন্নয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন করেছে ভিয়েতনাম। এছাড়া কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (সিপিটিপিপি), রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের (আরসিইপি) মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চুক্তিও করেছে। যার মাধ্যমে ইউরোপের ২৭টি দেশ, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলো স্বল্প ব্যয়ে শুল্কমুক্ত পণ্যের প্রবেশাধিকার পেয়েছে।

আসবাব উৎপাদকদের জন্য ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ নীতিকেও সহায়ক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রফতানিকারকদের জন্য কর অব্যাহতি দেয়া হয়। আসবাবসহ রফতানি খাতগুলোর জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ প্রদান এবং কাঁচামালের জন্য শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা অন্যতম।

অপরদিকে বাংলাদেশের আসবাব শিল্পের বেশির ভাগ কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। হার্ডওয়্যার, লিকার, ফ্যাব্রিকসসহ আরো অনেক কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়। কারণ দেশে এসব কাঁচামাল তৈরির কোনো ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। রফতানিমুখী অন্য খাতগুলোয় কাঁচামাল আমদানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা থাকলেও আসবাবের ক্ষেত্রে সবধরনের সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ খাতে কোনো রকম বন্ড সুবিধা নেই। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা অন্তত আংশিক বন্ড সুবিধার দাবি করছেন। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। উল্টো কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ককর আরো বাড়ছে। অন্যদিকে, রফতানির ওপর নগদ সহায়তাও কমিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ ফার্নিচার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক দেওয়ান আতিফ রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যে দ্বৈরথ সেখানে আমাদের একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু আমরা সেই সুযোগ নিতে পারছি না। মূলত প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছি না। অন্য দেশের তুলনায় আমাদের পণ্যের দাম বেশি। এর কারণ উৎপাদন খরচ বেশি। যেকোনো পণ্যের স্থানীয় ভ্যালু অ্যাডিশন গড়ে ৩০ শতাংশ এবং বাকি ৭০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এখন এ কাঁচামাল আমদানিতে ডিউটি দিতে হয় ৬৮-১০৫ শতাংশ পর্যন্ত। অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোয় দেখা যায় এখানে শূন্য ডিউটি সুবিধা রয়েছে। ফলে এখানেই আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাই।’

ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ আসবাব উৎপাদন ও রফতানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী। এসব দেশের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার বিষয়ে দেওয়ান আতিফ রশীদ বলেন, ‘‌সরকার অনেক নীতি ঘোষণা করেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের বাজারেও বিদেশী পণ্যের প্রবেশ বাড়বে। কারণ আমাদের উৎপাদন খরচ বেশি, অন্যদের কম।’

বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতি বলছে, বিশ্ববাজারে আসবাব বাণিজ্যের পরিমাণ ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানির অনেক সুযোগ রয়েছে। যথাযথ সহায়তা পেলে এ বাণিজ্য ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করতে পারবে।

গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আসবাব শিল্প খাতের রফতানি আয় ছিল ৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ কোটি ৩ লাখ ডলারে। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে এ খাতে রফতানি আয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। বর্তমানে ৬১টির বেশি দেশে আবসাবসামগ্রী রফতানি করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৩৮টি বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পান রফতানিকারকরা। আসবাব রফতানির আয়ের অর্ধেকই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সম্প্রতি সেখানেও রফতানি কিছুটা কমেছে। এছাড়া জাপান, ফ্রান্স, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, সৌদি আরব ও স্পেনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রফতানি হয়েছে।

আরও